জেলা প্রতিনিধি, যশোর: বেনাপোল সীমান্তে চোরাচালান প্রতিরোধ ও শুল্ক ফাঁকির মালামাল উদ্ধারে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) গোয়েন্দা তৎপরতা ও আভিযানিক কার্যক্রম অব্যাহত থাকলেও থেমে নেই অবৈধ কারবার। প্রকাশ্য দাপটের সাথেই চোরাচালান ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন লিটন ওরফে ‘গোয়েন্দা লিটন’।
অনুসন্ধানে জানা যায়, লিটনের জন্মস্থান যশোরের পুলেরহাট অঞ্চলে হলেও বৈবাহিক সূত্রে সাদিপুর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মোসলেমের কন্যাকে বিয়ে করে দীর্ঘ ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বেনাপোলে বসবাস করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে তিনি এখানে অবৈধ চোরাচালান পরিচালনা করার পাশাপাশি কাস্টমস গোয়েন্দা অধিদপ্তরের কতিপয় কর্মকর্তার নাম ভাঙিয়ে ঘুষের টাকা উত্তোলন করে আসছেন।
আওয়ামী লীগের ১৭ বছরের শাসনামলে নিজেকে যুবলীগ নেতা পরিচয় দিয়ে প্রভাব বিস্তার করলেও, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভোল পাল্টে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের সাথে সখ্য গড়ে তোলেন লিটন।
ভারত থেকে চোরাই পথে এবং পাসপোর্ট যাত্রীদের ‘ল্যাগেজ সুবিধার’ আড়ালে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে কসমেটিক্স, কম্বল, জুতা ও বিভিন্ন প্রসাধনী এনে রমরমা বাণিজ্য চালাচ্ছেন তিনি।
শুরুতে বন্দর ও বিজিবি ক্যাম্প সংলগ্ন এলাকার চোরাই মালামাল ক্রয়-বিক্রয়ে যুক্ত থাকলেও, পরবর্তীতে লিটন চোরাচালানের একচ্ছত্র হয়ে ওঠেন।
ঢাকা, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিন ভোরে শুল্ক ফাঁকির কসমেটিক্স কিনতে ভিড় জমান সাদিপুর রোডস্থ লিটনের দোকান ‘ত্যুর্য স্টোরে’।
শুধুমাত্র চোরাচালানেই ক্ষান্ত হননি লিটন। চেকপোস্ট ইমিগ্রেশনে গড়ে ওঠা ল্যাগেজ সিন্ডিকেটে আধিপত্য বিস্তারেও লিটন ও তার চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
গত ২৬ ও ২৭ সেপ্টেম্বর বেনাপোল চেকপোস্ট ইমিগ্রেশনে পাসপোর্ট ও ভিসার শর্ত লঙ্ঘনের সন্দেহে বেশ কিছু ভারতীয় নাগরিককে বাংলাদেশে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়।
এ নিয়ে ইমিগ্রেশন ডেস্কে যাত্রী ও কর্মকর্তাদের মধ্যে সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এর পরদিনই ভারতীয় পাসপোর্টধারীরা পেট্রাপোল সীমান্তে জড়ো হয়ে প্রতিবাদ জানান, যা বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, চেকপোস্ট ইমিগ্রেশনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে এবং নিজস্ব ব্যবসায়িক স্বার্থ হাসিলে লিটন নিজেই পরিকল্পনা করে ভারতীয়দের এই আন্দোলনে উৎসাহিত করেছিলেন।
তথ্যমতে, প্রতিদিন প্রায় ২০০ থেকে ৩৫০ জন ভারতীয় নাগরিক বিজনেস ভিসায় ভারত থেকে বিভিন্ন মালামাল বাংলাদেশে এনে বিক্রি করে ফিরে যান। এদের কারণে বেনাপোল ইমিগ্রেশনে কৃত্রিম জটলা তৈরি হয় এবং সাধারণ যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন।
এর আগে গত ২ আগস্ট বেনাপোল ইমিগ্রেশনে যাত্রী হয়রানি, অনিয়ম, ছিনতাই ও সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অর্থ আদায়ের অভিযোগে সংবাদ প্রকাশিত হয়।
কাস্টমসের সিসিটিভি ক্যামেরা এড়িয়ে মালামাল পারাপারের হুড়োহুড়ি ও আর্থিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে যাত্রীদের বাকবিতণ্ডা ও হাঙ্গামার ঘটনাও ঘটে, যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক ভাইরাল হয়।
লিটন ও তার সিন্ডিকেটের অপতৎপরতার কারণে সরকার প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হলেও, রহস্যজনক কারণে তাদের লাগাম টানতে প্রশাসন এখনো কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
অভিযুক্ত লিটনের বক্তব্য নেওয়ার জন্য তার সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ইমিগ্রেশন এলাকায় বিশৃঙ্খলার বিষয়টি নিশ্চিত করে বেনাপোল ইমিগ্রেশন চেকপোস্টের অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাইফুর রহমান খান জানান, ইমিগ্রেশন এলাকায় শৃঙ্খলা ফেরানো এবং সাধারণ যাত্রীসেবার মান বৃদ্ধিতে ইতোমধ্যেই নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যা দ্রুতই বাস্তবায়ন করা হবে।