মাহমুদুল হাসান, যশোর: রাত পোহালেই পবিত্র ঈদুল ফিতর। উৎসবের রঙে যখন চারপাশ রঙিন হওয়ার কথা, তখন যশোরের অভয়নগর উপজেলার চারটি গ্রামের আকাশ-বাতাস আচ্ছন্ন হয়ে আছে এক অজানা আতঙ্কে। কুখ্যাত সন্ত্রাসী ও একাধিক হত্যা মামলার আসামি নাসির ওরফে গুফরান (৪০) এবং তার গড়ে তোলা ‘গুফরান বাহিনী’র বেপরোয়া চাঁদাবাজি ও সশস্ত্র মহড়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছে কয়েক হাজার পরিবার।
উপজেলার ৭নং শুভরাড়া ইউনিয়নের গোপীনাথপুর, ধুলগ্রাম, ইছামতি এবং ভাটপাড়া গ্রামের প্রায় ১২ হাজার মানুষের কাছে এখন মূর্তিমান আতঙ্কের নাম গুফরান। বর্তমানে বাহিনী প্রধান নাসির ওরফে গুফরান ও তার দুই সহযোগী জেলহাজতে থাকলেও থামেনি তাদের বাহিনীর তাণ্ডব। তোসরুল মোড়ল, ওজিয়ার, মফিজ শেখ, ইমলাক মোড়ল, মান্দার খাঁ ও আনোয়ার শেখের মতো দুর্ধর্ষ সদস্যরা প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে এলাকায় মহড়া দিচ্ছে। নিয়মিত বোমাবাজি ও ফাঁকা গুলি ছুড়ে সাধারণ মানুষের মাঝে ভীতি সঞ্চার করাই এখন তাদের নিত্যনৈমিত্তিক কাজ।
সরেজমিনে গত বুধবার রাতে ইছামতি গ্রামে গিয়ে দেখা যায় এক ভিন্ন চিত্র। উৎসবের আমেজ নেই, নিরাপত্তার তাগিদে লাঠিসোটা নিয়ে রাতভর গ্রাম পাহারা দিচ্ছে সাধারণ মানুষ। গ্রাম পাহারায় থাকা দৈন্য বিশ্বাসসহ একাধিক ভুক্তভোগী জানান, ‘পরিবারের সদস্যদের জীবন রক্ষায় আমরা পালা করে জেগে থাকছি। আমাদের এলাকার নারী ও স্কুল-কলেজ পড়ুয়া কিশোরীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। গুফরান বাহিনীর হাত থেকে নিস্তার না পেলে ঈদ পালন করা আমাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছে।’
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিত্তবানদের টার্গেট করে লাখ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করছে এ বাহিনী। গত ১ মার্চ গোপীনাথপুর গ্রামের সোহেল শিকদারের বাড়িতে লুটপাট চালিয়ে স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকাসহ মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এর আগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি হিদিয়া গ্রামের সুশান্ত কুমার ও পবিত্র কুমার বিশ্বাসের বাড়িতে সশস্ত্র হামলা চালিয়ে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে সন্ত্রাসীরা।
এ ঘটনায় রাজধানী মুগদা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং-১২৭, তারিখ: ০২/০৩/২০২৬) করা হয়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, চাঁদা না দিলে তারা গবাদি পশু লুট এমনকি প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে।
যশোরের এক প্রভাবশালী নেতার ছত্রছায়ায় এই বাহিনী পরিচালিত হচ্ছে বলে এলাকায় জোরালো গুঞ্জন রয়েছে। তবে পুলিশ প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থার আশ্বাস দিয়েছে। যশোর জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (খ-সার্কেল) মো. রাজিবুল ইসলাম জানান, ‘সন্ত্রাসী গুফরানকে গ্রেপ্তারের পর থেকে ওই জনপদে বিশেষ নজরদারি ও নিয়মিত টহল অব্যাহত রয়েছে। যারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে আছে, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে অভিযান চলছে। পবিত্র ঈদ উৎসব যাতে সাধারণ মানুষ নির্বিঘ্নে পালন করতে পারে, সেজন্য অভয়নগর থানাকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
ভুক্তভোগী গ্রামবাসীর দাবি, কেবল মৌখিক আশ্বাস নয়, দৃশ্যমান কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে সন্ত্রাসীদের নির্মূল করা হোক। এই জনপদের মানুষ চায় ভয়হীন পরিবেশে ঈদের নামাজ ও উৎসব পালন করতে। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের নিয়মিত টহল জোরদার করাই এখন সময়ের দাবি।