,

শীতে পাহাড় ও সমুদ্রের হাতছানি

কক্সবাজার

বিডিনিউজ ১০ ভ্রমণ ডেস্ক: বেশ কিছুদিন ধরে পরিকল্পনা করছিলাম বন্ধুরা মিলে কক্সবাজার যাব। একসঙ্গে আনন্দময় কিছু সময় কাটাবো। সমুদ্র, পাহাড় আর প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যাব। কিন্তু কর্মময় জীবনে দু’তিন দিন সময় বের করা খুবই মুশকিল। সবার একসঙ্গে ছুটি মেলাও দায়। আবার সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন, পরিস্থিতি কোন দিকে যায় কে জানে? তখন রাস্তায় বের হওয়া নিয়েও সংশয় রয়েছে। তাই নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই কক্সবাজার যাওয়ার পরিকল্পনা করে ফেললাম। কিন্তু বন্ধুদের সবাইকে মেলাতে পারলাম না। সদ্য দেশে আসা কোরিয়া প্রবাসী বন্ধু জাকির তার স্ত্রীকে নিয়ে যেতে রাজি হয়ে গেল। আমিও সস্ত্রীক যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে ফেললাম। চারজনের ট্রেনের টিকিট ও হোটেল কনফার্ম করলাম।

৪ নভেম্বর সকাল ৭টায় ঢাকার বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনে উপস্থিত হলাম আমরা চারজন। অপেক্ষা ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী সোনার বাংলা এক্সপ্রেস ট্রেনের। সাড়ে ৭টায় স্টেশনে হাজির হলো বিরতিহীন সোনার বাংলা এক্সপ্রেস। ট্রেন থামতেই আমরা আমাদের নির্ধারিত আসনে গিয়ে বসলাম। পাঁচ মিনিট পর চলতে শুরু করলো ট্রেন। কিছুদূর যেতেই যাত্রীদের সকালের নাস্তা দিলো রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। তবে জনপ্রতি ট্রেনের ভাড়া গুনতে হয়েছে ৬০০ টাকা।

সকালে প্রকৃতিতে হালকা শীতের আভাস পাওয়া যাচ্ছিল। চারদিক কুয়াশায় ঢাকা ছিল। যেতে যেতেই বাইরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করলাম আমরা। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে চট্টগ্রাম অঞ্চলে ট্রেন ঢুকতেই দেখা মিললো ছোট-বড় পাহাড়ের। ট্রেন থেকে সবুজ পাহাড় দেখে মুগ্ধ হলাম আমরা। মনে হচ্ছিল প্রকৃতি যেন আমাদের স্বাগত জানাচ্ছে।

দুপুর সাড়ে ১২টায় চট্টগ্রাম রেল স্টেশনে পৌঁছালো সোনার বাংলা এক্সপ্রেস। ট্রেন থেকে নেমেই ৭ নভেম্বর রাতের ফিরতি টিকিট কিনতে কাউন্টারে গেলাম। কিন্ত ১০ নভেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে রাতে কোনো ট্রেনে সিট ফাঁকা নেই বলে জানানো হলো। বাধ্য হয়ে বাসে ফেরার সিদ্ধান্ত নিলাম আমরা।

এরপর কক্সবাজার যাওয়ার উদ্দেশে রেল স্টেশন থেকে ১১০ টাকা ভাড়ায় সিএনজি নিয়ে নতুন ব্রিজ এলাকায় গেলাম। সেখান থেকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার চলাচলকারী সৌদিয়া পরিবহনের টিকিট কিনলাম। ভাড়া নিলো জনপ্রতি ২৪০ টাকা। দুপুর দেড়টায় বাস ছাড়লো। কক্সবাজার শহরে বাস পৌঁছালো সন্ধ্যা পৌনে ৬টায়। সেখান থেকে ১০০ টাকায় সিএনজি নিয়ে পৌঁছালাম সুগন্ধা বিচ সংলগ্ন হোটেলে।

রুমে ঢুকেই দ্রুত ফ্রেশ হয়ে আমরা গেলাম সমুদ্র পাড়ে। একটু দূর থেকেই শোনা যাচ্ছিল সমুদ্রের গর্জন। আছড়ে পড়ছিল বড় বড় ঢেউ। রাত তখন প্রায় ৮টা। তবুও সমুদ্র পাড়ে পর্যটকদের ভিড়। আছেন ট্যুরিস্ট পুলিশের সদস্যরাও। সমুদ্র পাড়ে দাঁড়াতেই হিমেল হাওয়া আর সমুদ্রের বড় বড় ঢেউ হৃদয়ে প্রশান্তি ছড়িয়ে দিল। জার্নির ক্লান্তি অনেকটা দূর হয়ে গেল।

কিছুক্ষণ সেখানে আনন্দঘন সময় কাটালাম আমরা। এরপর ডিনার সেরে হোটেলে গিয়ে সেন্টমার্টিন যাওয়ার ব্যবস্থা করলাম। আমরা স্থানীয় একটি প্রতিষ্ঠানের সেন্টমার্টিন ভ্রমণের প্যাকেজ কিনেছিলাম। জনপ্রতি ১৯০০ টাকা নিয়েছিল তারা। তবে নিজের মত করে গেলে খরচ কিছুটা কম পড়বে। আমাদের সঙ্গে স্ত্রী থাকায় ঝামেলা এড়াতে প্যাকেজ কিনেছিলাম। কারণ রাস্তা অনেক দূরের।

সোমবার ভোর সাড়ে ৫টায় হোটেলের সামনে থেকে বাসে উঠলাম আমরা। বিভিন্ন হোটেল থেকে লোক তুলতে তুলতে টেকনাফের উদ্দেশ্যে বাস ছাড়লো ভোর ৬টায়। যেতে যেতেই উখিয়ায় গিয়ে দেখা গেল পাহাড়ের গায়ে গায়ে রোহিঙ্গাদের বসতি। ছোট ছোট ঝুপড়ি ঘর তুলে পাহাড়ে বাস করছে তারা। রোহিঙ্গাদের খাদ্য ও চিকিৎসা দিতে পাশেই রয়েছে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তা কেন্দ্র। এসব দেখতে দেখতেই সকাল পৌনে ৯টায় আমাদের বাস টেকনাফ জাহাজ ঘাটে পৌঁছলো। বাস থেকে নেমে সকালের নাস্তা সেরে নিলাম আমরা। যদিও বাসেই নাস্তা দিয়েছিল। কিন্তু সেটি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বাইরের নাস্তা খেতে হয়েছিল।

সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে জাহাজ ছাড়ার সময় সকাল সাড়ে ৯টা। জাহাজ ঘাটে টিকিট দেখিয়ে পাস নিলাম আমরা। এরপর সোজা গিয়ে উঠলাম বিলাসবহুল ‘বে ক্রুজ’ জাহাজে। নাফ নদের পাড় থেকে ঠিক সময়ে ছাড়লো জাহাজ। শুরু হলো প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে যাত্রা। নাফ নদের মোহনা দিয়ে ছুটে চললো জাহাজ। দুই পাশে সবুজ অরণ্য আর বড় বড় পাহাড়। বামে মিয়ানমার ডানে বাংলাদেশ। নাফ নদের মাঝেই দুই দেশের সীমান্ত। দুই পাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পর্যটকদের মোহিত করে। এসব পারি দিয়ে বেলা সাড়ে ১১টায় আমাদের জাহাজ প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে পৌঁছলো।

এই বিভাগের আরও খবর