,

সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রধান প্রতিবন্ধকতা ‘গুজব’

বিডিনিউজ ১০ ডেস্ক: জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে গুজবের ছড়াছড়ি। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে অপতথ্য, করা হচ্ছে অপপ্রচার। ছোট ছোট ঘটনাকে প্রচার করা হচ্ছে ফলাও করে। যা উসকে দিচ্ছে নির্বাচনি হাওয়াকে। ফলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘটেছে মব সহিংসতা, সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনা।
এমনকি বিচ্ছিন্নভাবে প্রাণহানির খবরও পাওয়া যাচ্ছে। তবে এসব অপতথ্য রোধে পুরোপুরি ব্যর্থ হচ্ছে নির্বাচন কমিশন। যদিও নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে থেকেই এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার ও গুজব প্রতিরোধে জোরালো পদক্ষেপ নিতে একাধিকবার ইসিকে পরামর্শ দেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা।
অতিসম্প্রতি শেরপুরে বিএনপির ও জামায়াত কর্মীদের পাল্টাপাল্টি হামলায় রেজাউল করিম নামে এক জামায়াত নেতা নিহত হয়েছেন। তিনি শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ছিলেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, চেয়ারে বসাকে কেন্দ্র করে এই ঘটনার সূত্রপাত ঘটলেও এটি শেষ পর্যন্ত ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। তারা জানান স্থানীয় মসজিদগুলোতে কিছু নেতাকর্মীরা মাইকিং করতে থাকেন। যার ফলে পুরো এলাকা মুহূর্তেই অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে প্রচারণা করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের তোপের মুখে পড়েন ঢাকা ৮ আসনের ১১-দলীয় জোটের শরিক এনসিপি প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী। এ সময় তাকে ডিম ছোড়া হয়েছে। গত মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর শান্তিনগরে হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজে এ ঘটনা ঘটেছে।
এ ঘটনায় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নাহিদ ইসলাম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী মির্জা আব্বাস ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেন। এরপরই এই ঘটনাকে কেন্দ্র শুরু হয় পক্ষে-বিপক্ষে সমালোচনা। এআই দিয়ে বানানো হয় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীসহ বেশ কয়েক জনের আহতের ছবি। এই ছবিতে কারও হাতে আবার কারও মাথাসহ গুরুতর আহত হতে দেখা যায়। ফলে বিষয়টি নিয়ে সামাজিকমাধ্যমেও নানা হাস্যরসাত্মক মন্তব্য করেন নেটিজনেরা।
এ ছাড়া কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে জমি সংক্রান্ত পারিবারিক বিরোধের জেরে ভাতিজার টেঁটার আঘাতে খুন হন চাচা মাহমুদুর রহমান কামাল। তবে এ ঘটনাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে রাজনৈতিক হামলা হিসেবে প্রচারের অপচেষ্টা চালানোর অভিযোগ উঠে। গত বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মাহমুদুর রহমান কামালের মৃত্যু হয়। একই ঘটনায় তার ছেলে গুরুতর আহত হন।
নিহত মাহমুদুর রহমান কামাল কটিয়াদী উপজেলার আচমিতা ইউনিয়নের পশ্চিম ভিটাদিয়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি আচমিতা ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক ইউপি সদস্য ছিলেন। তবে ঘটনার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে দাবি করা হয়, জামায়াতের কর্মীদের হামলায় তিনি নিহত হয়েছেন, যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অসত্য।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নিহত কামালের সঙ্গে তার বড় ভাই শিক্ষক জালাল উদ্দিনের দীর্ঘদিনের জমিসংক্রান্ত বিরোধ চলছিল। বৃহস্পতিবার সকালে জমি নিয়ে দুই ভাইয়ের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে জালাল উদ্দিনের ছেলে সাদ্দাম হোসেন সিদ্দিক টেঁটা দিয়ে তার চাচা মাহমুদুর রহমান কামালের মাথায় এবং তার ছেলে কাকনের হাতে আঘাত করে। এতে দুজনই গুরুতর আহত হন।
এরপর স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে প্রথমে কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় রেফার্ড করা হলে রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মাহমুদুর রহমান কামাল মারা যান। এই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে একটি স্বার্থান্বেষী মহল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে রাজনৈতিক রং দেওয়ার চেষ্টা চালায়। একাধিক ফেসবুক পোস্টে ‘জামায়াতের সন্ত্রাসী হামলা’ বলে প্রচার চালানো হলেও এর পক্ষে কোনো বাস্তব প্রমাণ নেই।
নিহতের ভাগ্নে শাহিদ উজ্জামান জানান, ‘খুনি সন্ত্রাসীদের কোনো দল হয় না। কোনা সম্পর্ক হয় না। খুনির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি। দয়া করে অপরাজনীতি থেকে বিরত থাকুন। কামাল আমার আপন ছোট মামা। পারিবারিকভাবে দীর্ঘদিন ধরে জমিজমা নিয়ে কলহ-বিবাদ ছিল। আজকে নিজেদের মধ্যে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে আমার মেজো মামার ছেলে অর্থাৎ উনার ভাতিজা সাদ্দামের দেশীয় অস্ত্রের আঘাতে মারা যান। এখানে দলীয় অপরাজনীতি থেকে বিরত থাকার জন্য অনুরোধ করছি।’
নিহত কামাল মেম্বারের ভাতিজা দেলোয়ার হোসেন কাজল বলেন, ‘দয়া করে কেউ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য নোংরামি করবেন না, এটা আমাদের পারিবারিক দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিনের, এটা পুরোনো। কটিয়াদী আচমিতার মানুষ জানে কোন একটা দলকে অযথা দায়ী করবেন না।’
ঘটনা সম্পর্কে আচমিতা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আব্দুল হান্নান বলেন, ‘এটি কোনো রাজনৈতিক ঘটনা নয়। জমিজমা নিয়ে আপন দুই ভাইয়ের পারিবারিক বিরোধ থেকেই এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে।’
কটিয়াদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুবুর রহমান জানান, ‘জমিসংক্রান্ত বিরোধের জেরে সংঘর্ষে মাহমুদুর রহমান কামাল গুরুতর আহত হন এবং পরে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এ ঘটনায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। পরিস্থিতি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং দুইজনকে আটক করা হয়েছে।’
এমন পরিস্থিতিতে সাইবার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত কয়েক মাসে নির্বাচনকেন্দ্রিক এআইভিত্তিক অপতথ্য ছড়ানোর হার অন্তত চার গুণ বেড়েছে। তবে এই প্রযুক্তিগত সুনামি মোকাবেলায় নির্বাচন কমিশন (ইসি), আইসিটি বিভাগ বা বিটিআরসির কার্যকর ও দ্রুত তৎপরতা এখনো চোখে পড়ছে না, যা সুষ্ঠু নির্বাচনি পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ। ইসি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ডিজিটাল নজরদারি বাড়ালেও প্রযুক্তির এই দ্রুতগতির সঙ্গে তাল মেলানোই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এআইয়ের অপপ্রয়োগ মোকাবিলায় আইন ও কিছু বিধি-বিধান থাকলেও কারিগরি সক্ষমতা ও বিশেষজ্ঞ জনবলের ঘাটতি রয়েছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর। এতে নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বেপরোয়া হয়ে উঠছে সাইবার অপরাধীরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচন কমিশনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে ভোটারদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা ছাড়া এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা সম্ভব নয়।
ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমার স্ক্যানার, ডিসমিসল্যাব ও ফ্যাক্ট ওয়াচের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলো বিশ্লেষণ করলে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে ভয়াবহ অপতথ্যের চিত্র পাওয়া যায়। ডিসমিসল্যাবের একটি ফ্যাক্টচেক রিপোর্টে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একজন পুলিশ কর্মকর্তার ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। ফ্যাক্টচেকাররা কারিগরি বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত করেছেন যে, ভিডিওটি সম্পূর্ণ কৃত্রিম বা ‘ডিপফেক’।
নির্বাচনি প্রচারণায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে দেশের নামি সংবাদপত্রের ও টিভি চ্যানেলের লোগো সংবলিত ভুয়া ‘ফটোকার্ড’। রিউমার স্ক্যানার সম্প্রতি একটি ফটোকার্ড শনাক্ত করেছে, যেখানে কার্ডসংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের গ্রাফিকস নকল করে ফটোশপের মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে।
ফ্যাক্টচেকিং প্ল্যাটফর্ম ডিসমিসল্যাবের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর মাসে নির্বাচন নিয়ে এআইকেন্দ্রিক অপতথ্য ফ্যাক্টচেক হয়েছিল চারটি, যা জানুয়ারি মাসের ২৮ তারিখ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ১৮টিতে পৌঁছেছে। অর্থাৎ নির্বাচনকেন্দ্রিক এআই অপতথ্য এক মাসে চার গুণেরও বেশি বেড়েছে।
আবার ২০২৫ সালে প্রকাশিত ফ্যাক্টচেকগুলো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ফেসবুকেই সবচেয়ে বেশি অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে। পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রতি ১০টি ফ্যাক্টচেকের একটি ছিল এআই দিয়ে তৈরি অপতথ্য নিয়ে।
২০২৫ সাল জুড়ে অনলাইন মাধ্যমে চার হাজারের বেশি অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে বলে ডিসমিসল্যাবের গবেষণায় উঠে এসেছে। এর মধ্যে দুই হাজার ৩৯১টিই রাজনৈতিক। অর্থাৎ গত বছর ছড়ানো অপতথ্যের প্রায় ৫৮ শতাংশ রাজনৈতিক। এর পরের অবস্থানেই আছে আইনশৃঙ্খলা ও ধর্মীয় অপতথ্য।
সবচেয়ে বেশি অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে ভিডিওর মাধ্যমে, যেগুলোর বেশিরভাগই এআই দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। দেশে কাজ করা ৯টি তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানের গত বছরের পাঁচ হাজারের বেশি যাচাই প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এমন তথ্য পেয়েছে ডিসমিসল্যাব।
এআইকেন্দ্রিক ভুল তথ্য বিশ্লেষণ করে ডিসমিসল্যাব জানিয়েছে বিভিন্ন এআই চরিত্রের মাধ্যমে নির্বাচন নিয়ে ভিত্তিহীন জরিপের বিবরণ দিতে। বিভিন্ন এআই দিয়ে তৈরি চরিত্র দাবি করে, কোনো একটি নির্দিষ্ট দল একটি নির্দিষ্ট শতাংশ ভোট পাবে। এইসব এআই চরিত্রের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যও দেখা যায়। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এআই ভিডিও দিয়ে নির্বাচনকেন্দ্রিক অপতথ্য ছড়াতেও দেখা গেছে।
ডিসমিসল্যাবের গবেষণা কর্মকর্তা আহমেদ ইয়াসীর আবরার বলেন, ‘রাজনৈতিক প্রচারণায় এআই ব্যবহার করার ঘটনা আমরা অনেক আগে থেকেই দেখতে পাচ্ছি। ২০২৫ সালের জুনেও ডিসমিসল্যাবের একটি প্রতিবেদনে আমরা দেখতে পেয়েছি রাজনীতি ও নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এআই জেনারেটেড ভিডিও প্রচার হতে। এ ছাড়া পিআর ক্যাম্পেইন নিয়েও আমরা রাজনৈতিক দলগুলোর এআই দিয়ে তৈরি ভিডিও প্রচার দেখতে পেয়েছিলাম। বর্তমানেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষে-বিপক্ষে এআই ভিডিওর মাধ্যমে প্রচারণা করা হচ্ছে।’
সুত্র-খোলা কাগজ

এই বিভাগের আরও খবর