,

রাত পোহালেই ভোট: কঠোর নিরাপত্তা তবু সংশয়

নিজস্ব প্রতিবেদক: দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাঠে নেমেছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় আট লাখ সদস্য। পাশাপাশি রয়েছেন দুই হাজার নির্বাহী ও ৬৫৩ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট। ভোটগ্রহণ ঘিরে এমন নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হলেও মাঠ পর্যায়ে উত্তাপ ও সংশয় দুই-ই বিরাজ করছে।

এর মধ্যেই দেশের বিভিন্ন স্থানে ভোটকেন্দ্রে হামলা ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। অনেক স্থানে প্রতিপক্ষ প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের ভয় দেখানো, ক্যাম্প ভাঙচুরসহ নানা অভিযোগ রয়েছে।

শুক্রবার রাতে রাজধানীর গোপীবাগে আন্তঃনগর ট্রেন বেনাপোল এক্সপ্রেসে দেওয়া আগুনে ঝরেছে প্রাণও। এমন পরিস্থিতির মধ্যে কাল দেশের ২৯৯টি আসনে ভোটগ্রহণ হতে যাচ্ছে।

এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত হতে যাচ্ছে দেশের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ। নির্বাচনে ভোটগ্রহণের সময় অনিয়ম হলে তাৎক্ষণিক সংশ্লিষ্ট কেন্দ্র বন্ধ করতে নির্দেশনা দিয়েছে ইসি।

নির্বাচন কমিশনার রাশেদা সুলতানা রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের কর্মকর্তাদের এক মোবাইল বার্তায়  যে কোনো স্থান থেকে আসা ‘শেষ মুহূর্তের মেসেজ’, ‘আগের রাতের মেসেজ’ ও ‘চূড়ান্ত মেসেজ’ আমলে না নিতে নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি শুধু ইসির নির্দেশনা মেনে ভোটগ্রহণ করতে নির্দেশনা দিয়েছেন।

বর্তমানে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ৪৪টি রাজনৈতিক দল রয়েছে। যদিও এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগসহ ২৮টি দল অংশ নিয়েছে। বিএনপিসহ ১৬টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল নির্বাচন বর্জন করছে। ভোট বর্জনের অংশ হিসাবে আজ ও কাল হরতাল ডেকেছে বিএনপি।

নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল অংশ না নিলেও আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে স্বতন্ত্র প্রার্থীরাই ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ নির্বাচনে দুই শতাধিক আসনে ৪৩৬ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। অপরদিকে ২৮টি রাজনৈতিক দলের সর্বমোট প্রার্থী রয়েছেন ১৫৩৪ জন। শুধু আওয়ামী লীগের প্রার্থী আছেন ২৬৬ জন।

বিএনপির ডাকা হরতালে ভোটগ্রহণে বিশেষ প্রভাব পড়বে না বলে দাবি করেছে নির্বাচন কমিশন। কমিশনের অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ ইসি সচিবালয়ে শুক্রবার সাংবাদিকদের বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার জন্য সেনাবাহিনী থেকে শুরু করে বিজেপি, র‌্যাব ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ভোটের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার জন্য তাদের সদস্য টহলে আছে। স্ট্রাইকিং ফোর্স তাদের টহল শুরু করেছে। ভোটারদের মনে যাতে কোনো ভীতি না থাকে সে বিষয়গুলো কমিশন নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নিয়েছে।

ইসি ১৫ নভেম্বর দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফশিল ঘোষণা করে। শুক্রবার সকাল ৮টায় প্রচার শেষ হয়েছে। এখন প্রার্থীরা অপেক্ষা করছেন ভোটগ্রহণের। কাল সকাল ৮টায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়ে চলবে বিকাল ৪টা পর্যন্ত। নির্বাচন ঘিরে বির্তক যাতে তৈরি না হয় এবং ভোটের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে এবারই প্রথম নির্বাচনের দিন সকালে ব্যালট পেপার পাঠানো হচ্ছে। তবে দুর্গম ও চরাঞ্চল এবং যাতায়াত সমস্যা রয়েছে এমন ২৯৭১ ভোটকেন্দ্রে আজ ব্যালট পেপার পাঠানো হবে।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৪২ হাজার ২৪টি ভোটকেন্দ্র ও দুই লাখ ৬০ হাজার ৮৫৬টি ভোটকক্ষ রয়েছে। ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তায় পুলিশ-আনসারের ১৫-১৭ জন সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় পৌনে সাত লাখ সদস্য শুক্রবার মাঠে নেমেছেন। এদিন ৬৫৩ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটও নেমেছেন। তারা নির্বাচনি অপরাধ দেখলে তাক্ষণিক সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে বিচার করবেন।

একনজরে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন : দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৯টি আসনে ভোটগ্রহণ হতে যাচ্ছে। একজন বৈধ প্রার্থী মারা যাওয়ায় ভোটের মাঝপথে নওগাঁ-২ আসনের ভোট বাতিল করেছে কমিশন। এ নির্বাচনে ভোটার রয়েছেন ১১ কোটি ৯৩ লাখ ৩২ হাজার ৯৩৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৫ লাখ ৯২ হাজার ১৯৭ জন, নারী ভোটার ৫ কোটি ৮৭ লাখ ৩৯ হাজার ৮৮৯ জন এবং হিজগা ভোটার ৮৪৮ জন। নির্বাচনে ৪২ হাজার ২৪টি ভোটকেন্দ্র এবং দুই লাখ ৬০ হাজার ৮৫৬টি ভোটকক্ষ রয়েছে।

নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা : এ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় আট লাখ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। তাদের মধ্যে পুলিশের এক লাখ ৭৪ হাজার ৭৬৭ জন, আনসার ব্যাটালিয়ন ৫ লাখ ১৪ হাজার ২৮৮ জন, সশস্ত্র বাহিনীর ৪০ হাজার সদস্য মোতায়েন রয়েছেন।

নির্বাচন কর্মকর্তাদের ইসি রাশেদার ১০ বার্তা:  নির্বাচনে ভোটগ্রহণ সামনে রেখে নির্বাচন কর্মকর্তাদের কাছে ১০টি বার্তা পাঠিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার রাশেদা সুলতানা। রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার, ডিআইজি, ডিসি ও এসপিসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে বৃহস্পতিবার এ বার্তা পাঠান তিনি।

এ নির্বাচনে এ দুই বিভাগের আওতাধীন সব জেলার দেখভাল করছেন এ কমিশনার। বার্তায় তিনি উল্লেখ করেন, ভোটকেন্দ্রের শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হলে সাময়িকভাবে ভোটগ্রহণ বন্ধ রাখতে হবে এবং তাৎক্ষণিকভাবে উপযুক্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে ভোটকেন্দ্রের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। ভোটগ্রহণকালে উদ্ভূত যে কোনো অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি বা সৃষ্ট বাধা-বিপত্তি বা বিভিন্ন অপচেষ্টা বা চ্যালেঞ্জ নিয়ন্ত্রণের আওতার বাইরে চলে গেলে ভোটগ্রহণ বন্ধ করতে হবে। প্রয়োজনে যত সংখ্যক কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ বন্ধ করা প্রয়োজন তত সংখ্যক কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ বন্ধ করতে হবে। ভোটগ্রহণ বন্ধের বিষয়টি ও সার্বিক কেন্দ্র পরিস্থিতি তাৎক্ষণিকভাবে কমিশনকে জানাতে হবে। কোনো কেন্দ্রে জাল ভোট, ব্যালট বাক্স ছিনতাই ইত্যাদি হলে সংশ্লিষ্ট ভোটকেন্দ্রের ভোট গণনায় অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।

কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, কোনো গুজবে দ্বিধাগ্রস্ত হবেন না। যদি কোনো গুজব বা বার্তা বা সংবাদ আপনাদের কাছে গুরুত্বারোপযোগ্য মনে হয়, সেক্ষেত্রে দ্বিধাহীন চিত্তে ও নিঃসংকোচে আমাকে সরাসরি ফোন করবেন। প্রয়োজনে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ প্রদান করবেন। মনে রাখতে হবে, ‘শেষ মুহূর্তের মেসেজ’, ‘আগের রাতের মেসেজ’, ‘চূড়ান্ত মেসেজ…’ ইত্যাদি বলতে কিছু নেই। এই মেসেজই (রাশেদার দেওয়া) সংশি¬ষ্ট সবার জন্য একমাত্র ও চ‚ড়ান্ত মেসেজ। অন্য বা ভিন্ন কোনো মেসেজ আমলে নেবেন না।

রাশেদা খানম কর্মকর্তাদের আরও লিখেছেন, পক্ষপাতমূলক আচরণ বা কার্যকলাপ বা ভ‚মিকা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না। এরূপ আচরণ প্রমাণিত হলে তার দায়-দায়িত্ব সংশ্লিষ্টদের ওপর বর্তাবে এবং ব্যক্তিগতভাবে বহন করতে হবে। কোনো প্রার্থী আচরণবিধি ভঙ্গ বা নির্বাচনি অপরাধ করলে তাৎক্ষণিকভাবে উপযুক্ত ও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অনিয়মের মাধ্যমে ভোটগ্রহণের অভিযোগ উত্থাপিত হলে কমিশন সে ভোটের ফলাফল গেজেট না করে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করবে। তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হলে কমিশন কর্তৃক ওই ভোট বাতিল করা হবে। সেক্ষেত্রে কমিশন পুনরায় ভোটগ্রহণের ব্যবস্থা করবে এবং দায়ী সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

 

এই বিভাগের আরও খবর