,

জেলা পরিষদ নির্বাচন হচ্ছে না

নিজস্ব প্রতিবেদক: করোনা মহামারির কারণে সব স্থানীয় নির্বাচন পিছিয়ে যাওয়ায় নির্ধারিত সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে না জেলা পরিষদ নির্বাচন। কেননা জেলা পরিষদে যারা ভোটার, তাদের সবাই এখনো নির্বাচিত হননি আর যারা হয়েছেন তারা অনেকেই মেয়র, চেয়ারম্যান, মেম্বার হিসেবে শপথও নিতে পারেননি। এ অবস্থায় জেলা পরিষদ নির্বাচন নির্ধারিত সময়ে হওয়া অনিশ্চিত জেনে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ মেয়াদ শেষে প্রশাসক নিয়োগের বিধান রেখে খসড়া আইনে অনুমোদন দেয় গত ২২ নভেম্বর। আর তা গত ২৩ জানুয়ারি সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে উত্থাপিত হয়।

সংসদের ১৭তম অধিবেশনে এটি পাস হয়ে গেলে জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগের আইনটি চূড়ান্ত হবে, সেক্ষেত্রে প্রশাসক নিয়োগে আর বাধা থাকবে না বলে জানান স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম। এদিকে জেলা পরিষদে প্রশাসক বসাতে আইন পাসের জন্য বিল উত্থাপিত হওয়ায় এর সমালোচনা করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে জেলা পরিষদের মেয়াদ শেষ হয়েছে। এর ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা থাকলেও করোনা মহামারির কারণে সময়মতো ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা, পৌরসভা নির্বাচন, সিটি করপোরেশনের ভোট শেষ না হওয়ায় জেলা পরিষদ নির্বাচন আপাতত হওয়া সম্ভব নয়। ইসি সূত্র জানিয়েছে, সদ্য বিদায়ী কে এম নূরুল হুদার নির্বাচন কমিশন চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে জেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে চাইলেও ইউপি, পৌরসভা ও উপজেলা নির্বাচন শেষ করতে না পারায় সেটা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। সম্প্রতি ৮ দফায় দেশের ৪ হাজার ৭০০ ইউপির মধ্যে ৪ হাজার ২ শতের মতো ইউপিতে নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে ১০ ফেব্রুয়ারি। যার গেজেট প্রকাশ করা হয় ১৫ ফেব্রুয়ারি। এখনো অনেক ইউপিতে চেয়ারম্যান-মেম্বাররা শপথ না নেয়ায় জেলা পরিষদের ভোটার তালিকা সম্পন্ন হয়নি বলে ইসি সূত্রে জানা গেছে।

এদিকে বর্তমানে নির্বাচন কমিশন সিইসি ও কমিশনার শূন্য। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি বিদায় নিয়েছে নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন। এবার সার্চ কমিটির মাধ্যমে নতুন ইসি গঠন প্রক্রিয়াধীন। ফেব্রুয়ারির ২০-২৫ তারিখের মধ্যে নতুন ইসি গঠনের তোড়জোড় চলছে। নতুন কমিশন গঠন হলে তাদের আওতায়ই জেলা পরিষদ নির্বাচন হবে। তবে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, নতুন ইসি গঠন, শপথ নেয়াসহ তাদের গুছিয়ে উঠতে বেশ কিছু সময় লাগবে, সে কারণে জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

এদিকে গত ১০ জানুয়ারি দেশের সব জেলা পরিষদের মেয়াদ শেষ হয়েছে। তার আগে প্রশাসক নিয়োগের জন্য গত ২৩ জানুয়ারি সংসদের ১৬তম অধিবেশনে জেলা পরিষদ আইনের সংশোধনী বিল আকারে তোলেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম। বিলে বলা হয়েছে, জেলা পরিষদের মেয়াদ শেষ হলে পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনায় সরকার প্রশাসক নিয়োগ দিতে পারবে। যা সংসদের আগামী ১৭তম অধিবেশনে পাস হতে পারে। মূলত প্রশাসক নিয়োগ ও সদস্য সংখ্যা কম-বেশি করা- এ দুটি বিধানকে প্রাধান্য দিয়ে এ বিলটি উত্থাপিত হয়েছে।

বিদ্যমান আইন ও প্রস্তাবিত আইনে নির্বাচকমণ্ডলী (ভোটার) হিসেবে একই ধরনের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের রাখা হয়েছে। তবে বিদ্যমান আইনে ভোটার তালিকা নির্বাচন কমিশনের প্রণয়নের কথা থাকলেও প্রস্তাবিত আইনে সেটা বলা হয়নি। আইন অনুযায়ী জেলার অন্তর্গত সিটি করপোরেশনের (যদি থাকে) মেয়র ও কাউন্সিলররা, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানরা, পৌরসভার মেয়র ও কাউন্সিলর এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা জেলা পরিষদের ভোটার। তবে জেলা ভেদে ভোটার সংখ্যা কম-বেশি হতে পারে বলে সংশোধনীতে বলা হয়েছে।

উল্লেখ্য, দেশের ৬১ জেলায় ২০১৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর প্রথমবারের মতো জেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৭ সালের ১১ জানুয়ারি তারা শপথ নেন। ওই বছরের জানুয়ারি মাসে জেলা পরিষদগুলোর প্রথম বৈঠক হয়। ফলে পরিষদের ৫ বছরের মেয়াদ জানুয়ারি মাসেই শেষ হয়। জেলা পরিষদ আইন অনুযায়ী, পরিষদের মেয়াদ শেষ হওয়ার ১৮০ দিন আগে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে। নির্বাচন না হলে কী হবে, সেটা আইনে উল্লেখ করা নেই। তবে নির্বাচিত নতুন পরিষদ দায়িত্ব না নেয়া পর্যন্ত বর্তমান পরিষদের কাজ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে বা সরকার ইচ্ছে করলে প্রশাসক নিয়োগ দিতে পারবে, যেটি বিল আকারে পাস করে আইনটি পাকাপোক্ত করার চেষ্টা করছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়।

এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম জানান, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানদের পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষে নির্বাচন না হলে প্রশাসক নিয়োগ দেয়ার বিধান রাখা হয়েছে সংশোধিত আইনে। এরই মধ্যে আইনটি সংসদে উত্থাপিত হয়েছে।

মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে জেলা পরিষদ নির্বাচন সম্ভব কিনা জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ বলেন, যেসব জেলার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সম্পন্ন হবে সেখানে জেলা পরিষদ নির্বাচন করার একটি সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু বর্তমান কমিশনের মেয়াদ তো শেষ হয়ে গেল। সম্প্রতি মোটামুটি সব ইউপিতে ভোট শেষ হলেও জেলা পরিষদ নির্বাচন করতে ভোটার তালিকা প্রস্তুতসহ আরো কিছু সময় প্রয়োজন। আপাতত জেলা পরিষদে ভোট হওয়ার সম্ভবনা দেখছি না, নতুন কমিশন গঠন হলে তারা এ ভোটের ব্যবস্থা করবে। পরিষদের মেয়াদ শেষ হলে কী হবে জানতে চাইলে এ অতিরিক্ত সচিব বলেন, এটা সরকারের বিষয়। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বিষয়টি দেখবে।

এ বিষয়ে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম বলেন, বিদ্যমান আইনে জেলা পরিষদের মেয়াদ শেষ হলে প্রশাসক নিয়োগের সুযোগ নেই। তবে জেলা পরিষদ আইন সংশোধন করে মেয়াদ শেষে নির্বাচন না হলে প্রশাসক নিয়োগের বিধান করতে সংসদে বিল উত্থাপিত হয়েছে। আগামী অধিবেশনে এটি পাস হতে পারে। মেয়াদ শেষ হলে অনেক সময় জটিলতা সৃষ্টি হয় বলেই আমরা আইন সংশোধন করে এই বিধান যুক্ত করছি। স্থানীয় সরকারের কিছু পরিষদে এ বিধান আছে। অন্যগুলোতেও এটা করতে চাচ্ছি।

এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ জানান, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা একেবারে ভেঙে পড়েছে। স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলোকেও ‘সংসদীয় ব্যবস্থায়’ নিয়ে যেতে হবে। কাউন্সিলর থেকে মেয়র হবেন, ইউপিতেও সদস্যদের থেকে চেয়ারম্যান হবেন, তেমনি জেলা পরিষদেও সদস্যরা ভোট দিয়ে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচিত করবেন। তাতে উত্তেজনা কম হবে। খরচ কম হবে। সংঘাত সংঘর্ষের ঘটনাও কমবে। তবে টাকা ও পেশিশক্তির প্রভাব নিয়ন্ত্রণের সুপারিশ করেন তিনি।

ড. তোফায়েল আহমেদ আরো বলেন, স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হলে জেলা পরিষদ নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এখানে ভোটাররা জনগণের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, তাদের ভোটে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার কথা। তবে সরকার নির্বাচন না করে প্রশাসক নিয়োগের জন্য সংসদে যে বিল উত্থাপন করেছে, একে তিনি ‘গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর’ ও ‘কর্তৃত্ব নিয়ন্ত্রণে’ রাখার ব্যবস্থা বলে মন্তব্য করেন। তিনি নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কারের ওপরও জোর দেন।

এই বিভাগের আরও খবর


AllEscort